শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১২

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের শুনানী বাতিলের দাবিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বিক্ষোভ

সিএইচটি নিউজ বাংলা, ১৮ মে ২০১২
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের শুনানী বাতিল ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় একযোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ১৮ মে শুক্রবার, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে অবিলম্বে ভূমি কমিশনের শুনানী বাতিল করে পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি, ভূমি বেদখল বন্ধ করা ও বেদখলকৃত ভূমি ফিরিয়ে দেয়া, ভূমি কমিশনের অগণতান্ত্রিক ধারা সংশোধন ও ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যানকে অপসারণ এবং সেটলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ও তাদেরকে দেয়া অবৈধ ভূমি বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। আগামী ২০ মে'র মধ্যে ভূমি কমিশনের শুনানী কার্যক্রম বাতিল করা না হলে আবারো বৃহত্তর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলে সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে এ বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে।


খাগড়াছড়ি সদর : খাগড়াছড়ি জেলা সদরের মহাজন পাড়া থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে চেঙ্গী স্কোয়ার ঘুরে স্বনির্ভর বাজারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে ইউপিডিএফ কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি নতুন কুমার চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রীনা দেওয়ান ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুমেন চাকমা। এছাড়া সংহতি জানিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ি পৌর কাউন্সিলর ও নির্বাচিত জুম্ম জনপ্রতিনিধি সংসদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মিলন দেওয়ান মনাঙ, শরণার্থী কল্যাণ সমিতির অর্থ সম্পাদক সুকৃতি জীবন চাকমা। গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি নিকোলাস চাকমা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি আপ্রুসি মারমা সমাবেশে উপস্থাপনা করেন।

মহালছড়ি : সকাল ১১টায় মহালছড়ি উপজেলা সদরের বাবু পাড়া থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে মহালছড়ি বাজার প্রদক্ষিণ করে সড়ক ও জনপদ বিভাগের মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক সর্বানন্দ চাকমা, মহালছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি ঊষাময় খীসা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মহালছড়ি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক রতন স্মৃতি চাকমা।

দিঘীনালা : খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলা সদরের ইউপিডিএফ কার্যালয়ের সামনে থেকে বেলা ২টায় একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে দিঘীনালা থানা বাজার প্রদক্ষিণ করে বাস স্টেশন হয়ে লারমা স্কোয়ারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক রেমিন চাকমা, দিঘীনালা উপজেলা শাখার সভাপতি বিধান চাকমা, সহ সভাপতি জীবন চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের দিঘীনালা উপজেলা শাখার সভাপতি রজেন্টু চাকমা। গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের দিঘীনালা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলো জীবন চাকমা সমাবেশ পরিচালনা করেন।

পানছড়ি : পানছড়ি উপজেলার কলেজ গেট থেকে বেলা ২টায় একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি পানছড়ি বাজার প্রদক্ষিণ করে বাস স্টেশনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের পানছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি বরুণ চাকমা, সহ সাধারণ সম্পাদক রহিন ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের পানছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি অপরাজিতা খীসা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সহ সভাপতি চন্দ্রদেব চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অর্পন চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের পানছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি বিবর্তন চাকমা।

গুইমারা : মাটিরাঙ্গা উপজেলার গুইমারা উচ্চ বিদ্যালয় গেট থেকে বেলা ২টায় একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে গুইমারা বাজার প্রদক্ষিণ করে আবর উচ্চ বিদ্যালয় গেটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মাটিরাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি সুমন্ত ত্রিপুরার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি ক্যহলাচিং মারমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের মাটিরাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি পঞ্চসেন ত্রিপুরা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মাটিরাঙ্গা উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক প্রবীর ত্রিপুরা। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মাটিরাঙ্গা উপজেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক চিত্রজ্যোতি চাকমা সমাবেশ পরিচালনা করেন।

কুদুকছড়ি : রাঙামাটি জেলা সদরের কুদুকছড়িতে দুপুর সাড়ে ১২টায় একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি বিলাস চাকমার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইকেল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কণিকা দেওয়ান, ৩নং সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিমুল বিকাশ চাকমা, ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অমর জীবন চাকমা ও কুদুকছড়ি এলাকার বিশিষ্ট মুরুব্বী প্রাণবাঁশী চাকমা। সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক তাপুমনি চাকমা ও উপস্থাপনা করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক বাবলু চাকমা। এছাড়া ৪নং কুদুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সন্তু বিকাশ চাকমা ও বুড়িঘাট ইউপি চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসা সমাবেশে উপস্থিত থেকে সংহতি জ্ঞাপন করেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল কুদুকছড়ি বাজার প্রদক্ষিণ করে বড় মহাপুরম উচ্চ বিদ্যালয় গেটে গিয়ে শেষ হয়।

নান্যাচর : বিকল ২টায় রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলা সদরের বিশ্রামাগার থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে উপজেলা সদরের কাছাকাছি পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পুলিশ ব্যানার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। ফলে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নান্যাচর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা বক্তব্য রাখেন।

কাউখালী : রাঙামাটির কাউখালীতে বিকাল ৩টায় উপজেলা খেলোয়াড় সমিতি মাঠ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে পোয়া পাড়া ঘুরে আবার খেলোয়াড় সমিতি মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)এর কাউখালী ইউনিটের প্রতিনিধি অনি বিকাশ চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি অর্জন দেওয়ান, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য রূপন মারমা ও পাহাড়ি  ছাত্র পরিষদের কাউখালী থানা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা।

বাঘাইছড়ি : রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা মাঠ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে বাঘাইছড়ি বাজার প্রদক্ষিণ করে চৌমুহনী শাপলা চত্বরে গিয়ে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বঙ্গলতলী শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক লক্ষ্মী মিত্র চাকমার উপস্থাপনায় এতে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অঙ্গদ চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি অটল চাকমা।

এসব সমাবেশে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতিবাদ-বয়কটের পরও ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী বার বার একতরফা শুনানীর আয়োজন করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তিনি স্বৈরাচারী এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নিয়ে আসা বহিরাগত সেটলাররা যে হাজার হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করেছে তার আইনগত বৈধতা দেয়ার জন্য চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ কমিশনের এই এক তরফা শুনানী কখনোই মেনে নেবে না।

বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণ যুগ যুগ ধরে প্রথাগত পদ্ধতিতে ভূমি ভোগ-দখল করে আসছে। কিন্তু ভূমি কমিশন পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকে অস্বীকার করে অগণতান্ত্রিক ও এক তরফাভাবে ভূমি সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বক্তারা হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, আগামী ২০ মে'র মধ্যে শুনানী কার্যক্রম বাতিল করা না হলে আবারো বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। কমিশন যদি ভূমি সমস্যা সমাধানের নামে জটিলতা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে যে কোন পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী থাকতে হবে।

বক্তারা অবিলম্বে ভূমি কমিশনের শুনানী বাতিল ও সকল কার্যক্রম বন্ধ করা, প্রথাগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি বেদখল বন্ধ করা ও বেদখলকৃত ভূমি ফিরিয়ে দেয়া, ভূমি কমিশনের অগণতান্ত্রিক ধারা সংশোধন, সেটলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ও সেটলাদের দেয়া অবৈধ ভূমি বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি জানান।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী আগামী ২৩ ও ২৪ মে নতুন শুনানীর তারিখ ধার্য করেছেন। ইতিপূর্বে জনগণের ব্যাপক প্রতিবাদ ও বয়কটের মুখে ২৮-২৯ ফেব্রুয়ারী এবং ২-৩ মে দুই বার শুনানীর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এক তরফা, ষড়যন্ত্রমূলক ও অগণতান্ত্রিকভাবে নতুন ওই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।