রাজনৈতিক
ভাষ্য, সিএইচটি নিউজ বাংলা, ৪ জুন ২০১২
গত মে মাসের শেষের দিনগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিকভাবে
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, ২০ মে রাঙামাটি শহরে বোমা বিষ্ফোরণ ও
এতে ১১ জন ছাত্রের আহত ও পরে একজনের মৃত্যু হওয়ার ঘটনা। দুই, ২৩ ও ২৪ মে ভূমি
কমিশনের শুনানী বাতিল ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতে তিন পার্বত্য
জেলায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ডাকে ৩৬ ঘন্টা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ। তিন,
২৮ মে ঢাকায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠান। নিচে এ ঘটনাগুলোকে
নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
১
রাঙামাটিতে বোমা বিষ্ফোরণ: cui bono?
রাঙামাটিতে বোমা বিষ্ফোরেণর ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইউপিডিএফ ও
জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। সন্তু গ্রুপ দৃশ্যত রাজনৈতিক
ফায়দা তোলার হীন উদ্দেশ্যে ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে। তবে ইউপিডিএফকে দায়ী
করলেও সন্তু গ্রুপের লোকজন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে না যে এ ঘটনা ইউপিডিএফ ঘটিয়েছে।
পুলিশ ঘটনাকারীকে এখনো চিহ্নিত ও আটক করতে পারেনি।
চুক্তির পর গত দেড় দশকে সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড
জনগণের মধ্যে বহু অসন্তোষ, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক শত্রু সৃষ্টি করেছে। ইউপিডিএফ ছাড়াও
জেএসএস-এর সরাসরি প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে জেএসএস (এমএন লারমা)। কয়েক মাস আগে সন্তু
গ্রুপ বরকলে ৫ বাঙালিকে অপহণ করলে সেটলারদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিবাদ ও
বিক্ষোভ দেখা দেয়। সমঅধিকার সন্তু লারমার আঞ্চলিক পরিষদের অফিস আক্রমণ করে। সন্তু
গ্রুপ এরপর কাপ্তাই থেকে আওয়ামী লীগের এক নেতা অনিল তনচঙ্গ্যাকে অপহরণ করে। তাকেও
আজ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া হয়নি। এছাড়া রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও
রাজস্থলী এলাকায় সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গত কয়েক বছরে শতাধিক লোককে
অপহরণ কিংবা খুন করেছে। এই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুদ্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে থেকে যদি কেউ ওই
হামলা ঘটিয়ে থাকে, তাহলে অবাক হওয়ার কোন ব্যাপার আছে?
যখন জানা বা ন্যায়সঙ্গতভাবে ধারণা করা যায় না কারা ঘটনা
ঘটিয়েছে তখন ল্যাটিন ভাষায় প্রশ্ন করা হয় cui bono? অর্থাৎ ঘটনা থেকে কে বা কারা
লাভবান হচ্ছে? যে বা যারা লাভবান হচ্ছে তারাই ঘটনার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এখন
পাঠক বিচার করবেন রাঙামাটির বোমা বিষ্ফোরণ ঘটনা থেকে কারা লাভবান হচ্ছে।
সন্তু গ্রুপের উচিত ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করে
নির্মোহ
ও নিরাবেগ সহকারে ঘটনার বিশ্লেষণ করা ও সেই অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া। ইউপিডিএফ যদি
হামলা করে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইতো, তাহলে আমার ধারণা তারা
সমাবেশের আগে অথাৎ সমাবেশে যোগদানে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে হামলা চালাতো। সেটাই
তাদের দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত ও স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে সমাবেশ
শেষে, যখন বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য ছাত্ররা কল্যাণপুরে পেট্রোল পাম্পে গাড়ির অপেক্ষা
করছিল। আর ঘটনার পর ইউপিডিএফ যে লাভবান হয়নি তা তো সবার কাছে স্পষ্ট।
ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক, লাভের খাতায় কিন্তু সন্তু লারমা
ঠিকই নাম উঠাতে সক্ষম হয়েছেন। এ ঘটনা তার জন্য ইংরেজীতে যাকে বলে একেবারে a shot in the arm. তিনি
ঘটনাকে ব্যবহার করে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরদার করেন। এমনকি চুক্তি
বাস্তবায়ন কমিটির সভায়ও তিনি এই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। চুক্তি বাস্তবায়নের
চাইতে ইউপিডিএফকে
নিষিদ্ধ করা বেশী জরুরী বলে মন্তব্য করেন। এক কথায়, ঘটনার পর তিনি যা করেন তাতে
মনে হয় তিনি যেন এ ধরনের ঘটনার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন।