"পূর্ণস্বায়ত্তশাসন" পন্থী জুম্মদের ওপর নির্যাতন
বাংলাদেশ সরকার 'পূর্ণস্বায়ত্তশাসন' পন্থী কর্মীদেরকে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং তাদের অস্তিত্বকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত সামরিক উপস্থিতি জায়েজ করার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এইসব কর্মীরা সব সময় প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক পন্থায় কার্যক্রম চালালেও এবং নবগঠিত ইউপিডিএফ-এর ঘোষিত লক্ষ্য কোনভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদী না হওয়া সত্বেও তাদেরকে 'সন্ত্রাসী' আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোও খুবই একপাক্ষিক চিত্র তুলে ধরে এবং ইউপিডিএফ কর্মী ও তাদের সমর্থকদেরকে শান্তিবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে। এর ফলে প্রকৃতই কি ঘটছে তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা না দিয়ে এবং বাংলাদেশে আদিবাসীদের জাতিগত পরিচিতি ও স্বায়ত্তশাসনের অর্থ কি সে সম্পর্কে জাতীয় বিতর্কের সূচনা না করে তা তাদেরকে অপরাধপ্রবণ হতে মদদ যোগায়। এই 'পূর্ণস্বায়ত্তশাসন' কর্মীদেরকে চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়।
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে সর্বমোট ১২০ জনের অধিক জুম্মকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের অনেককে পুরোন (প্রধানত বানোয়াট) মামলায়৷ দৃশ্যতঃ শান্তিচুক্তিতে জেএসএস সদস্যদের প্রতি সাধারণ ক্ষমার বিধান এদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন্য নয়। ......
দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা
উপরোল্লেখিত পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে কতিপয় বিশিষ্ট বয়স্ক জুম্ম নেতা যেমন উপেন্দ্র লাল চাকমা (জুম্ম শরণার্থী ওয়েলফেয়ার এসোশিয়েশনের সভাপতি), অনন্ত বিহারী খীসা ও অন্যান্যরা ১০ এপ্রিল ১৯৯৮ একটি শান্তি কমিটি গঠন করেন। উপেন্দ্র লাল চাকমা এর আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সন্তু লারমা ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথে কোন প্রকার আলোচনা চালাতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইউপিডিএফ জানিয়েছে যে, তারা জেএসএস-এর সাথে সমঝোতায় আসতে ইচ্ছুক এবং অনেক জেএসএস সদস্যও তা চায়, কিন্তু জেএসএস নেতৃবৃন্দ তাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজী নয়। একইভাবে জেএসএস এর দাবী হলো তারা ১৯৯৫ সাল থেকে ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথে কথা বলে আসছে, কিন্তু শান্তিচুক্তির পর থেকে শেষোক্তরা আর আলোচনায় বসতে চায় না; তাদেরকে খুন করতে চায়।
মধ্যস্থতার অন্যান্য প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। তবে ইউপিডিএফ-এর ভাষ্য মতে, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০০ স্থানীয় পর্যায়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। খাগড়াছড়িতে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতিন্দ্র লাল চাকমা জেএসএস এর পক্ষে এবং দীপ্তি শংকর চাকমা ইউপিডিএফ-এর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা সম্মত হয় যে, উভয় পক্ষ অপহৃতদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা দেবে, চলাচলের ক্ষেত্রে একে অপরকে বাধা দেবে না, অন্য পরে সভা সমিতি ও মিছিলে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না এবং ভবিষ্যতে আলোচনার সময় ও স্থান মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ঠিক করা হবে। কিন্তু এই চুক্তি দৃশ্যত বেশী দিন টেকেনি। ইউপিডিএফ অভিযোগ করেছে যে, জেএসএস চুক্তি লঙ্ঘনন করে আবার খাগড়াছড়িতে তাদের বেশ কয়েকজন লোককে মেরে ফেলেছে, এদের মধ্যে তারা কুমার চাকমা ও কালাইয়া চাকমাকে ৮ মার্চ ২০০০ এবং সদয় সিন্ধু চাকমা ও সুইমং মারমাকে ২৮ এপ্রিল ২০০০।
সুপারিশ:
খ. জুম্ম জনগণের উদ্দেশ্যে
পার্বত্য চট্টগ্রামে অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও একটি নতুন সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে -- এই লক্ষ্যের জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে এত লোক জীবন দিয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন আহ্বান জানাচ্ছে:
১.যে, জেএসএস ও ইউপিডিএফ উভয়েই এবং তাদের সহযোগী সংগঠনসমূহ যেন ভবিষ্যতে কোন সংঘাত এড়িয়ে চলতে এবং মতামত প্রকাশের অধিকারসহ মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতিবোধের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে নিজেদের সংযত রাখে।
২.যে, উভয় পক্ষ সমঝোতায় উপনীত হোন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলতে দিক যেখানে উভয় পক্ষ একে অপরের অস্তিত্বকে স্বীকার করে, এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা অথবা সহযোগিতা করুক।
৩.যে, ইউপিডিএফ এর সদস্য ও তাদের সহযোগীদের উপর নির্যাতন ও গ্রেফতার বন্ধ করতে এবং আটককৃত সকল বন্দীর, তারা যে মতাবলম্বীই হোক না কেন, মুক্তি নিশ্চিত করতে জেএসএস সরকারের সাথে তার সম্পর্ককে যাতে কাজে লাগা(ক)। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন বিশ্বাস করে যে, শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী হিসেবে জেএসএস-এর এ ক্ষেত্রে দায় দায়িত্ব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন মনে করে, শান্তিচুক্তি কেবল তখনই সফল হবে যদি শান্তিচুক্তির উভয়পক্ষ -- সরকার ও জেএসএস-- কর্তৃক ব্যক্তিক ও সমষ্টিগত অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সবার সংগঠন করার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়।
....................................
শেষের লাইনটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। আপডেট ৪ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের মার্চ মাসে। শুরুতেই ইউপিডিএফ-এর ওপর কী পরিমাণ নিপীড়ন নির্যাতন চলেছে তা এই রিপোর্ট থেকেও কিছুটা আঁচ করা যায়। এই নিপীড়ন এখনো অব্যাহত আছে।