সিএইচটি নিউজ বাংলা, ৫ আগস্ট ২০১৩, সোমবার
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মানবাধিকার
পরিবীক্ষণ সেলের প্রধান সচিব চাকমা আজ ৫ আগস্ট জানিয়েছেন, এ বছর জানুয়ারী থেকে ৩ আগস্ট
পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গায় পাহাড়ি গ্রামে ৫ বার সেটলার হামলা হয়েছে। এতে ১৪টি
গ্রামের কয়েক শ’ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়, ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়, হতাহত হয় কয়েক ডজন
পাহাড়ি ও বাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে অথবা ভারত সীমান্তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন কয়েক হাজার নারী
পুরুষ শিশু ও বৃদ্ধ। কোন কোন ক্ষেত্রে একই গ্রাম একাধিক বার হামলার শিকার হয়েছে। এসব
হামলায় বিজিবির সদস্যদের বিরুদ্ধে সহায়তা দেয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
ইউপিডিএফ মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেল-এর সংগৃহীত তথ্য অনুসারে,
২৫ জানুয়ারী সেটলাররা হৃদয় মারমা পাড়া ও হেমঙ্গ কার্বারী
পাড়ায় হামলা চালিয়ে পাহাড়িদের ২টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ৩৪টি বাড়ি ভাঙচুর ও জিতসুখ
বৌদ্ধ বিহার তছনছ করে দেয়। বটতলিতে একটি ব্রিক ফিল্ডে গুলিতে এক শ্রমিক নিহত হওয়ার
পর তারা এই বর্বরোচিত হামলা চালায়।
২ এপ্রিল ৪০-৫০ জন সেটলার প্রাণ কুমার পাড়ার দুর্জয় ত্রিপুরার
বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করে। বিজিবি হামলার সময় সেটলারদের সাথে ছিল।
৫ এপ্রিল সেটলাররা বড়নাল ইউনিয়নের ওয়ার্ড মেম্বার রফিকের
নেতৃত্বে বড়নাল ইউনিয়নের প্রাণ কুমার পাড়ায় দ্বিতীয় বারের মতো হামলা চালিয়ে ১০ পাহাড়িকে
আহত করে। ২৭ জুম্ম পরিবার ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজিবির সদস্যরা হামলার সময়
সেটলারদের পেছনে ছিল। হামলাকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতা হাসেম, কালাম মিঞা, মনির,
জাকির, মোমিন ও করিম ছিল বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
১৮ জুন রাতে গোমতি বাজারের পাশে বান্দরছড়া থেকে ২০০ সেটলার
টাকার মনি পাড়ায় হামলা চালালে ৪০ পরিবার পাহাড়ি গ্রামবাসী ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য
হয়। হামলার আগে সেটলাররা তাদের সড়ক অবরোধ পালন কালে সাইনবোর্ড এলাকায় পাহাড়িদের বাড়িতে
হামলা চালানোর হুমকি দেয়। এ সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সেটলাররা
মুসলিম পাড়া, গোইয়া পাড়া, চর পাড়া, আদর্শ গ্রাম ও নতুন পাড়ায় মিটিঙ করে পাহাড়িদের বাড়িঘরে
হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
৩ আগস্ট তাইন্দং এ সেটলারা বিজিবির সহায়তায় ১০টি পাহাড়ি
গ্রামে হামলা চালিয়ে কয়েক শ’ বাড়িঘরে আগুন দেয় ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। হামলায় অজ্ঞাত
সংখ্যক পাহাড়ি নিহত ও ৫০ জন আহত হয়। কয়েক হাজার পাহাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে নো ম্যান্স
ল্যান্ডে ও ১৬০ পরিবার পানছড়ির উল্টাছড়িতে আশ্রয় নেয়।
পরিবীক্ষণ সেল শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাবেশে বাধার
ঘটনা উল্লেখ করে আরো জানিয়েছে, উক্ত সময়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা গণতান্ত্রিক
যুব ফোরাম, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতাকমী ও সাধারণ গ্রামবাসীসহ
মোট ১৬ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ৭ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়, ১ জনকে হাতে অস্ত্র গুঁজে
দিয়ে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়, ২ জনকে ৫৪ ধারায় আটক দেখানো হয় এবং ৬০ বছরের বৃদ্ধসহ ৪
জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা সাজানো হয়।
এছাড়া গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের এক নেতাকে খুন ২ পাহাড়ি
নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় বলে ইউপিডিএফ মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেল জানিয়েছে।
ইউপিডিএফ’র মানবাধিকার পরির্বীক্ষণ সেল কর্তৃক
প্রকাশিত মাটিরাঙ্গা-গোমতি-তাইন্দং এলাকায় পাহাড়িদের উপর হামলা ও দমন-পীড়নের বিস্তারিত
তথ্য নিম্নরূপ:
৪ জানুয়ারী: মাটিরাঙ্গা জোনের এক দল সেনা গভীর রাতে বাল্যাছড়ির
১ নং তৈমাতাই রাবার বাগানে একটি বাড়িতে ঢুকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় এবং
ঘরটি ভেঙে দেয়। সেনারা বরেন ত্রিপুরা, ৪৫, নামে অপর এক ব্যক্তির বাড়িতেও তল্লাশী চালায়।
২৪ জানুয়ারী: জনৈক সেটলার তবলছড়িতে রিপ্রু টিলা নামক স্থানে
৭ বছর বয়সী পাহাড়ি মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। মেয়েটি তবলছড়ি পিকে সরকারী প্রাইমারা
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।
২৫ জানুয়ারী: সেটলাররা হৃদয় মারমা পাড়া ও হেমঙ্গ কার্বারী
পাড়ায় হামলা চালিয়ে পাহাড়িদের ২টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ৩৪টি বাড়ি ভাঙচুর ও জিতসুখ
বৌদ্ধ বিহার তছনছ করে দেয়। বটতলিতে একটি ব্রিক ফিল্ডে গুলিতে এক শ্রমিক নিহত হওয়ার
পর তারা এই বর্বরোচিত হামলা চালায়।
২৮ জানুয়ারী: সেনাসদস্যরা রাতে কান্ত মনি পাড়ার কার্বারী
যুদ্ধ মনি চাকমার (৪০) বাড়িতে একটি বন্দুক রেখে তাকে সন্ত্রাসী সাজানোর ব্যর্থ চেষ্টা
চালায়।
১ ফেব্রুয়ারী: বিজিবির পলাশপুর জোনের সদস্যরা আমতলি ইউনিয়নের
অপূর্ণ মহাজন পাড়ার বাসিন্দা ধর্মজয় ত্রিপুরার ছেলে কলিন কুমার ত্রিপুরাকে (৩৫) আটক
করে। তার হাতে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
২ এপ্রিল: ৪০-৫০ জন সেটলার প্রাণ কুমার পাড়ার দুর্জয় ত্রিপুরার
বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করে। বিজিবি হামলার সময় সেটলারদের পাশে ছিল।
৫ এপ্রিল: সেটলাররা বড়নাল ইউনিয়নের জনৈক নেতৃত্বে ুবড়নাল
ইউনিয়নের প্রাণ কুমার পাড়ায় দ্বিতীয় বারের মতো হামলা চালিয়ে ১০ পাহাড়িকে আহত করে। ২৭
জুম্ম পরিবার ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজিবির সদস্যরা হামলার সময় সেটলারদের
পেছনে ছিল।
১৮ মে: সন্তু গ্রুপের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা সেটলারদের সহায়তায়
গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম নেতা পঞ্চসেন ত্রিপুরাকে বেলছড়ি ইউনিয়নের শুভ রঞ্জন হেডম্যান
পাড়ার তার নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে।
১৯ মে: পলাশপুর জোনের বিজিবি সদস্যরা গোমতি ইউনিয়নে টাকারমনি
পাড়ায় হানা দিয়ে ৪ নিরীহ পাহাড়ি গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করে।
৮ জুন: পলাশপুর জোনের বিজিবি সদস্যরা গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম
মাটিরাঙ্গা উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুশান্ত ত্রিপুরা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের
সদস্য অমল ত্রিপুরাকে গ্রেফতার করে।
১২ জুন: প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের
পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ প- করে দেয়। ১৮ মে পঞ্চসেন ত্রিপুরার হত্যার প্রতিবাদে এ সমাবেশের
ডাক দেয়া হয়েছিল। ১৪৪ ধারা জারির প্রতিবাদে ডিওয়াইএফ মাটিরাঙ্গা-মানিকছড়ি ও রামগড় এলাকায়
পরদিন সড়ক অবরোধ পালন করে।
১৮ জুন: সকালে সেটলাররা তাদের সড়ক অবরোধ পালন কালে সাইনবোর্ড
এলাকায় পাহাড়িদের বাড়িতে হামলা চালানোর হুমকি দেয়। এ সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা
পালন করে। এছাড়া সেটলাররা মুসলিম পাড়া, গোইয়া পাড়া, চর পাড়া, আদর্শ গ্রাম ও নতুন পাড়ায়
মিটিঙ করে পাহাড়িদের বাড়িঘরে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বলে গোপন সূত্রে জানা যায়।
১৮ জুন: গোমতি বাজারের পাশে বান্দরছড়া থেকে ২০০ সেটলার
টাকার মনি পাড়ায় হামলা চালালে ৪০ পরিবার পাহাড়ি গ্রামবাসী ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য
হয়।
২৮ জুন: পলাশপুর জোনের বিজিবি সদস্যরা গোমতি ইউনিয়নে হেডম্যান
পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে দজেন্দ্র ত্রিপুরার ছেলে বাপ্পি ত্রিপুরাকে (৪২) গ্রেফতার করে।
তাকে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে মানসিক নির্যাতন শেষে পরদিন সকালে ছেড়ে দেয়া হয়।
৮ জুলাই: খাগড়াছড়ির স্বনির্ভরস্থ ঠিকাদার ভবনে মাটিরাঙ্গার
পাহাড়ি ও বাঙালি প্রতিনিধিদের মধ্যে ৭ দফা সমঝোতা হয়। এতে বাঙালিদের পক্ষে স্বাক্ষর
করেন মাটিরাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান সামছুল হক ও গোমতি ইউনিয়নের মেম্বার মোঃ রফিকুল
ইসলাম। পাহাড়িদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ইউপিডিএফ মাটিরাঙ্গা উপজেলা ইউনিটের সংগঠক চন্দন
চাকমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জিকো ত্রিপুরা।
সমঝোতা মোতাবেক গোমতি এলাকার টাকার মনি পাড়া ও প্রাণ কুমার
পাড়ায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পাহাড়ি পরিবারকে ৮ আগস্ট এর মধ্যে বাঙালিরা ক্ষতিপূরণ
প্রদান করা হবে, গণতান্ত্রিক কর্মসূচীতে বাঙালি সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বীগণের সর্বাত্মক
সহায়তা প্রদান করবেন, এলাকার জনগণের বিশেষত পাহাড়িদের নিরাপত্তার স্বার্থে পাহাড়ি-বাঙালি
মিলে একটি নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হবে, বাঙালি মুরুব্বী ও জনপ্রতিনিধিগণ ক্ষতিগ্রস্ত
পাহাড়ি পরিবারদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও দুঃখ প্রকাশ করবেন ও ভবিষ্যতে এ ধরনের কোন
অন্যায় হবে না এই মর্মে দৃঢ় অঙ্গীকারপূর্বক পাহাড়িদের আশ্বস্ত করবেন, এক্ষেত্রে প্রশাসন,
জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বীগণ সবত্মক সহযোগিতা প্রদান করবেন। সমঝোতা বাস্তবায়নের অগ্রগতি
পর্যালোচনার জন্য ৩০ জুলাই রিভিউ মিটিঙ হবে। সমঝোতা স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে গণতান্ত্রিক
যুব ফোরাম গোমতি বাজার বয়কট কর্মসূচী প্রত্যাহার করবে।
১৫ জুলাই: বিজিবির সদস্যরা গোমতি বাজারের পার্শ্ববর্তী
১৮৭ নং গড়গরিয়া মৌজার হেডম্যান অনিল বিকাশ রোয়াজার বাড়ি থেকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে হিল
উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাদ্রী চাকমা ও দীঘিনালা থানা কমিটির
সদস্য চম্পা চাকমাকে থানায় আটক করে। পরে চাপের মুখে ঐ দিন রাতে পুলিশ তাদেরকে ছেড়ে
দিতে বাধ্য হয়। তারা ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সমাবেশ সফল করতে
সাংগঠনিক কাজে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে পুলিশের বাধার মুখে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।
২৫ জুলাই: সেনা সদস্যরা বাল্যাছড়ি সাইনবোর্ড এলাকায় নির্মল
ত্রিপুরার দোকান থেকে রেঙকঙ পাড়ার জগদীশ ত্রিপুরার ছেলে সুমন্ত ত্রিপুরা, ২২, ও ওয়াসুর
বাসিন্দা মনিন্দ্র ত্রিপুরার ছেলে কিরণ বিকাশ ত্রিপুরাকে (২৫) গ্রেফতার করে। তাদেরকে
পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হলে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়।
২৯ জুলাই: সেনা সদস্যরা সাপমারা থেকে একই পরিবারের ৩ জন
সহ ৪ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। এর মধ্য ৬০ বছরের এক বৃদ্ধও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির
মিথ্যা মামলা সাজানো হয়।
৩১ জুলাই: গভীর রাতে সেটলারা “সন্ত্রাসী এসেছে, সন্ত্রাসী
এসেছে” বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাইন্দং বাজারে জড়ো হয় এবং পাহাড়ি-বিদ্বেষী উস্কানিমূলক
সাম্প্রদায়িক শ্লোগান দিতে থাকে। এ সময় ভয়ে পার্শ্ববর্তী পাঁচটি পাহাড়ি গ্রাম হেডম্যান
পাড়া, বগা পাড়া, পোমাং পাড়া, তানাকা পাড়া ও ৩ নং কলিন্দ্র কার্বারী পাড়া থেকে কয়েক
শ’ পরিবার ভারতের সীমান্তে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
২ আগস্ট: বকুল নামে টহলরত এক পুলিশ সদস্য রাতে বাল্যাছড়ি
এলাকায় কুবুতরছড়া যাত্রী ছাউনির পাশে মংপাই মারমার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।
----